মার্কিন অর্থনীতির দুর্বলতা ও ট্রাম্পের শুল্কনীতির অভিঘাত

বিশ্বজুড়ে সরকারি বন্ডের বিক্রয় চাপ বাড়ছে

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের মধ্যকার টানাপড়েন এখন গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও সুদহারের মধ্যকার টানাপড়েন এখন গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি, সরকারি ঋণের ঊর্ধ্বমুখিতা ও ফেডের নীতিসিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা নিয়ে। দেশটির অর্থনীতির সুচকগুলোও খুব একটা স্বাভাবিক আচরণ করছে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের এ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির জোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নানামুখী অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এসব দেশে এখন সরকারি বন্ড থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহারের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি বন্ডের বিক্রয় চাপও এখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। খবর আনাদোলু।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি স্বল্পমেয়াদে দেশটির ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করছিলেন অনেকেই। যদিও গত সপ্তাহেই ট্রাম্প নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে এ শুল্কনীতির প্রয়োগ শুরু করেছেন বলে রায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক ফেডারেল আপিল আদালত। হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। সেখান থেকেও এ শুল্কনীতিকে বেআইনি ঘোষণা করা হলে আমদানি খাত থেকে ট্রাম্পের রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা অনেকটাই ভেস্তে যাবে। আবার এ শুল্কনীতি দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রশাসনের রাজস্ব আহরণকে শক্তিশালী করবে নাকি আরো চাপে ফেলবে, সে বিষয়েও সংশয় রয়েছে বাজারে।

ধারণা করা হচ্ছে, ১৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির (এফওএমসি) বৈঠকে সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সাধারণত স্বল্পমেয়াদে সুদহার কমানো হলে বন্ডের ইল্ড কমে যায়। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বারবার ও অতিরিক্ত মাত্রায় সুদহার কমানো হলে বাজারে অস্থিতিশীলতা ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে বেড়ে যায় দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ডও।

এ অস্থিতিশীলতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি বন্ডের ইল্ড কার্ভ এখন খাড়া হয়ে বাড়ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাজারে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে। এ প্রবণতা এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশেও দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় থাকা ফ্রান্সে ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড এখন ৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে এটি পৌঁছেছে ৪ দশমিক ৬৯ শতাংশে। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি জাপানেও এ প্রবণতার শুরু দেখা যাচ্ছে। দেশটিতে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড রেট ছিল ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত এ পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের দিকে ঝুঁকেছে। গত বুধবার মূল্যবান ধাতুটির দাম আউন্সপ্রতি রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫৭৮ ডলার ৫৪ সেন্টে পৌঁছে যায়।

প্রসঙ্গত, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সাধারণত বন্ডের ইল্ড রেট অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে তা ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এক্ষেত্রে প্রধান অনুঘটকের কাজ করে বন্ডের মূল্য ও ইল্ড রেটের মধ্যকার বিপরীতমুখী সম্পর্ক। বন্ডের ইল্ড রেট বেশি হলেও মূল্যপতনের কারণে সেখান থেকে প্রত্যাশামাফিক রিটার্ন তুলে নিতে পারেন না বিনিয়োগকারীরা। এ কারণে তাদের মধ্যে বন্ড থেকে বিনিয়োগ স্থানান্তরের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

দেশে দেশে এখন এ প্রবণতাই দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তুরস্কভিত্তিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান গেদিক ইনভেস্টমেন্টের গবেষণা বিশেষজ্ঞ বুরাক পিরলানতা বলেন, ‘মূলত আর্থিক সমস্যার কারণে মার্কিন বন্ডের ইল্ড রেটের উত্থান ঘটছে। দেশটিতে এখন বাজেট ঘাটতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন কর হ্রাস ও ব্যয়ের পরিকল্পনা ঋণের বোঝা বাড়িয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।’

তিনি জানান, চীনের ওপর ট্রাম্পের উচ্চ শুল্ক প্রস্তাব বৈশ্বিক বাণিজ্য শৃঙ্খলকে ব্যাহত করে মূল্যস্ফীতি বাড়াচ্ছে এবং বন্ডের চাহিদা কমাচ্ছে। এর সঙ্গে জাপান ও যুক্তরাজ্যের পরিস্থিতি সংকটকে আরো গভীর করছে। জাপানে মূল্যস্ফীতি যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে, বাজেট ঘাটতিও খুব বেশি। এতে ব্যাংক অব জাপান (বিওজে) সুদহার বাড়াতে পারে। দেশটিতে সর্বশেষ বন্ড নিলামে চাহিদা খুব দুর্বল ছিল, ফলে সরকারি ঋণের সুদও বেড়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সেখানে রাজস্বের তুলনায় সরকারি ঋণ বেশি। দেশটিতে গিল্টের ইল্ড ১৯৯৮ সালের পর সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই) মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে সুদহার কমাতে বাধ্য হয়েছে, যা বাজার আস্থাকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বুরাক পিরলানতা বলেন, ‘স্বর্ণ ও রুপার মতো সম্পদের দাম দ্রুত বাড়ছে। স্বর্ণের দাম এ বছর ৩৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে বিনিয়োগকারীরা দৃশ্যমান সম্পদের প্রতি বেশি আস্থা রাখছেন। বৈশ্বিক রিজার্ভে মার্কিন ডলারের হিস্যা কমছে। স্বর্ণের মজুদ ৩০ বছরের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। এর বিপরীতে বন্ডের ইল্ড বাড়ার পেছনে আর্থিক সমস্যা, মূল্যস্ফীতির চাপ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মুদ্রানীতি কাজ করছে। জাপান ও যুক্তরাজ্যের সংকট বৈশ্বিক বাজারের জন্য সতর্কবার্তা, কারণ বিনিয়োগকারীরা সামনের দিনগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি বন্ড এড়িয়ে স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদে বিনিয়োগ আরো বাড়াতে পারেন।’

তুরস্কভিত্তিক আরেক আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান তাসিরলারের প্রধান অর্থনীতিবিদ একিন চিনার বলেন, ‘সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ড রেটে প্রভাব ফেলে। বিশেষত যুক্তরাজ্যের মতো দেশের বাজেট ঘাটতি বাজারে চাপ সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পরিস্থিতি আলাদা হলেও জাপানেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোয় স্বল্পমেয়াদে বন্ড ইল্ড হয়তো কমতে পারে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও সুদহারের বাস্তব তথ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক মৌলভিত্তিগুলোকে এখন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ এসব তথ্য উপেক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রে যদি রাজনৈতিক চাপে ধারাবাহিকভাবে সুদহার কাটছাঁট করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ সুদহার স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘মার্কিন কংগ্রেস বড় আকারের ব্যয়বিল পাস করেছে। ট্রাম্প সুদহার কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এর যৌক্তিকতা নেই। কারণ দেশটির কর্মসংস্থান বাজারের দুর্বলতা ও মুদ্রাস্ফীতি এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। দ্রুত সুদহার কমালে বাজারে এ ধারণা তৈরি হবে যে ফেডকে পরে আরো বেশি কঠোর হতে হবে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বন্ড ইল্ড আরো বেড়ে যেতে পারে। ফেডে জেরোম পাওয়েলের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। আমরা দেখছি, ফেড সদস্যদের হিসেবে ট্রাম্পের দাবির প্রতি সহনশীলদের নাম আসছে। তাই ভবিষ্যতে সুদহার আরো কমানো হতে পারে এমন আশঙ্কায় বাজার আরো অস্থির হয়ে ওঠার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।’

আরও